বিজ্ঞানীরা প্রথমবার মহাবিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী চুম্বকীয় বস্তু “ম্যাগনেটার” এর জন্ম প্রত্যক্ষ করেছেন। যা একটি অস্বাভাবিক উজ্জ্বল সুপারনোভার কেন্দ্র থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এই আবিষ্কারটি সম্ভব হয়েছে আইনস্টাইনের এর “সাধারণ আপেক্ষিকতা” তত্ত্বের পূর্বাভাসের মাধ্যমে, যা বিস্ফোরিত নক্ষত্রের আচরণ ব্যাখ্যায় প্রথমবার সরাসরি ব্যবহৃত হলো।

ম্যাগনেটার হলো এক ধরনের নিউট্রন তারকা। যার চৌম্বক ক্ষেত্র পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ৩০০ ট্রিলিয়ন গুণ বেশি শক্তিশালী। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, “অতি উজ্জ্বল সুপারনোভা” বা অত্যন্ত উজ্জ্বল নক্ষত্র বিস্ফোরণের পেছনে ম্যাগনেটারের ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত তার সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আকাশে বিস্ফোরিত হওয়া SN 2024afav নামের সুপারনোভা বিশ্লেষণ করে এই প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই সুপারনোভার আলো ২০০ দিনের বেশি সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। বিশ্বজুড়ে একাধিক টেলিস্কোপ এর ডেটা সংগ্রহ করে।
ম্যাগনেটার জন্ম
সাধারণ সুপারনোভার মতো ধীরে ধীরে ম্লান না হয়ে, SN 2024afav-এর আলো কয়েকবার উজ্জ্বল ও ম্লান হয়েছে, যা “wobble” বা দোলনের মতো আচরণ। এই দোলনই প্রমাণ করে যে, বিস্ফোরণের কেন্দ্রে একটি ম্যাগনেটার তৈরি হয়েছে। নবজাতক ম্যাগনেটারটি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২৩৮ বার ঘোরে (প্রতি ৪.২ মিলিসেকেন্ডে একবার ঘূর্ণন সম্পন্ন করে)। এর চারপাশে একটি “Accretion Disk” তৈরি হয়, যা গ্যাস ও ধূলিকণার সমন্বয়ে গঠিত এবং এটি অসমমিত হওয়ায় দোলন সৃষ্টি করে।
আরো পড়ুনঃ বায়ুমণ্ডল না থাকলে সূর্য কেমন দেখাতো?
এই দোলনের কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে “লেন্স-থিরিং প্রিসেশন” নামক একটি প্রভাব, যা সাধারণ আপেক্ষিকতা এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই প্রভাবের ফলে ডিস্কটি ম্যাগনেটারের ঘূর্ণন অক্ষের সাথে সামঞ্জস্য না রেখে দুলতে থাকে। ফলে আলো কখনো বাড়ে আবার কখনো কমে। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে “মহাজাগতিক বাতিঘর” বা মহাজাগতিক বাতিঘর হিসেবে তুলনা করেছেন। কারণ এটি নির্দিষ্ট সময় পরপর আলো ছড়ায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই সুপারনোভার আলোতে চারটি স্পষ্ট “কিচিরমিচির” বা সংকেত পাওয়া গেছে, যা সময়ের সাথে ছোট ও দুর্বল হয়েছে। পূর্বে ধারণা ছিল, ম্যাগনেটার তৈরি হতে পারে নিউট্রন তারকার সংঘর্ষ থেকেও, কিন্তু এই গবেষণাই প্রথম সরাসরি প্রমাণ দিয়েছে একটি সুপারনোভা থেকে ম্যাগনেটারের জন্ম। তবে সব সুপারলুমিনাস সুপারনোভা ম্যাগনেটার দ্বারা তৈরি হয় না, কিছু ক্ষেত্রে গ্যাস ও ধূলির “গুটি” থেকেও এমন উজ্জ্বল বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ভবিষ্যতে ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি ব্যবহার করে আরও অনেক “কিচিরমিচির সুপারনোভা” খুঁজে পাওয়ার আশা করছেন বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার মহাবিশ্বের বিস্ময়কর শক্তি ও পদার্থবিজ্ঞানের গভীর রহস্য উন্মোচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
সূত্রঃ লাইভ সায়েন্স