পৃথিবীর বয়স কত, এই প্রশ্ন মানুষের কৌতূহলের আকাশে অনেক দিন ধরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে ধূমকেতুর মতো। একসময় বিজ্ঞানী ও দার্শনিকেরা এ নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন—কেউ ভাবতেন পৃথিবী চিরন্তন, আবার কেউ বলতেন এর শুরু আছে, শেষও আছে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে এসে নিউক্লিয়ার ফিজিকস যেন সময়ের গোপন তালা খুলে দিল। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন, ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয় ধর্ম ব্যবহার করেই পৃথিবীর বয়স নির্ণয় করা সম্ভব।

ইউরেনিয়াম একটি তেজস্ক্রিয় মৌল, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয় হয়ে সিসায় পরিণত হয়। এই ক্ষয়ের একটি নির্দিষ্ট গতি আছে, যাকে বলা হয় অর্ধায়ু। ইউরেনিয়াম-২৩৮-এর অর্ধায়ু প্রায় ৪৫০ কোটি বছর। অর্থাৎ, কোনো ইউরেনিয়ামের নমুনা যদি শুরুতে সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ থাকে, তবে ৪৫০ কোটি বছর পরে তার অর্ধেক ইউরেনিয়াম সিসায় রূপান্তরিত হবে, আর বাকি অর্ধেক থাকবে অপরিবর্তিত।
প্রাচীন শিলার ভেতরে পাওয়া ইউরেনিয়ামের আকরিক বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, সেখানে ইউরেনিয়াম ও সিসার পরিমাণ প্রায় সমান। এর মানে দাঁড়ায়, একসময় ওই আকরিকের সবটুকুই ইউরেনিয়াম ছিল, যার অর্ধেক ক্ষয় হয়ে সিসায় পরিণত হয়েছে। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট হয়, ওই শিলাগুলোর বয়স প্রায় ৪৫০ কোটি বছর। আর যেহেতু এই শিলাগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন স্তরে পাওয়া যায়, তাই পৃথিবীর বয়সও এর কাছাকাছি।
আরো পড়ুন: পৃথিবীসদৃশ ৪৫টি গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা
আরও একটি সূত্র আসে সূর্য থেকে। সূর্যের ভর, আলোর বর্ণালি ও নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে জানা যায়, সূর্যের বয়স প্রায় ৫০০ কোটি বছর। যেহেতু পৃথিবী সূর্যের পরেই গঠিত হয়েছে, তাই পৃথিবীর বয়স কখনোই সূর্যের চেয়ে বেশি হতে পারে না। সব মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন—পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪৫৪ কোটি বছর।
তবে শুধু পৃথিবী নয়, তেজস্ক্রিয়তার এই জাদু দিয়ে জানা যায় অতীতের আরও অনেক গল্প। প্রাচীন কাঠ, ফসিল, কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের বয়স নির্ণয়েও ব্যবহৃত হয় একই ধারণা। এখানে ইউরেনিয়ামের বদলে ব্যবহৃত হয় কার্বন-১৪ নামের একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ।
কার্বন-১৪ তৈরি হয় বায়ুমণ্ডলে, যখন মহাকাশ থেকে আসা কসমিক রশ্মি নাইট্রোজেনের নিউক্লিয়াসে আঘাত করে। এই প্রক্রিয়ায় নাইট্রোজেন রূপান্তরিত হয়ে কার্বন-১৪-তে পরিণত হয়। এরপর এই তেজস্ক্রিয় কার্বন উদ্ভিদে প্রবেশ করে, খাদ্যচক্রের মাধ্যমে প্রাণীদেহে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে জীবন্ত প্রাণীর দেহে সবসময় একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে কার্বন-১২ ও কার্বন-১৪ থাকে।
কিন্তু প্রাণী বা উদ্ভিদের মৃত্যু হলেই এই প্রবাহ থেমে যায়। তখন থেকে কার্বন-১৪ ক্ষয় হতে শুরু করে, কিন্তু কার্বন-১২ অপরিবর্তিত থাকে। কার্বন-১৪-এর অর্ধায়ু প্রায় ৫,৭৬০ বছর। অর্থাৎ, প্রতি ৫,৭৬০ বছরে এর পরিমাণ অর্ধেকে নেমে আসে। এই অনুপাত মেপেই বিজ্ঞানীরা নির্ণয় করতে পারেন কোনো জীবাশ্ম বা নিদর্শনের বয়স।
সব মিলিয়ে বলা যায়, তেজস্ক্রিয়তার এই সূক্ষ্ম ঘড়ি ছাড়া পৃথিবীর বয়স নির্ণয় করা প্রায় অসম্ভব ছিল। সময়কে সরাসরি দেখা যায় না, কিন্তু ইউরেনিয়াম আর কার্বন যেন সেই অদৃশ্য সময়কে ধরে রেখেছে পরমাণুর ভেতরে নীরব, অথচ নির্ভুল এক হিসাবরক্ষকের মতো।
সূত্র: স্পেস.কম