মানব ইতিহাসে কিছু দিন আছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ নয় সেগুলো যেন ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়া মুহূর্ত। ১২ এপ্রিল তেমনই এক দিন।
১৯৬১ সালের এই দিনে সোভিয়েত নভোচারী ইউরি গ্যাগারিন প্রথম মানুষ হিসেবে মহাকাশে পা রাখেন। ‘ভস্টক-১’ নভোযানে চড়ে তিনি মাত্র ১০৮ মিনিটে পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করেন। এই সংক্ষিপ্ত সময়ই মানবজাতির জন্য হয়ে ওঠে এক বিশাল লাফ, পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মহাশূন্যে প্রথম পদচিহ্ন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৭ বছর। পৃথিবী তখন শীতল যুদ্ধের উত্তাপে বিভক্ত, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিযোগিতা তুঙ্গে। কে আগে মহাকাশ জয় করবে, সেই লড়াইয়ে সবার আগে পতাকা উড়িয়ে দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন, আর সেই ইতিহাস লেখেন গ্যাগারিন।
ভস্টক-১ ছিল সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় একটি নভোযান। গ্যাগারিনের কাজ ছিল পর্যবেক্ষণ, আর প্রয়োজনে জরুরি নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। যাত্রার সূচনায় তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে আসে এক শব্দ “পোয়েখালি!” অর্থাৎ “চলো যাই!” এই একটি শব্দই যেন মানব সাহসের প্রতিধ্বনি হয়ে আজও মহাকাশে ভেসে বেড়ায়। প্রায় ৩২৭ কিলোমিটার উচ্চতায় পৃথিবী প্রদক্ষিণ শেষে নিরাপদে ফিরে আসেন তিনি। তাঁর এই সফল প্রত্যাবর্তন শুধু একটি দেশের নয়, পুরো মানবজাতির বিজয় হিসেবে ইতিহাসে লেখা হয়ে আছে।
১২ এপ্রিল আরেকটি কারণেও স্মরণীয়। ১৯৮১ সালের এই দিনে নাসা প্রথমবারের মতো উৎক্ষেপণ করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য মহাকাশযান ‘কলম্বিয়া’। এটি ছিল মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন অভিজ্ঞ নভোচারী জন ইয়াং এবং নবীন নভোচারী রবার্ট ক্রিপেন। তারা প্রায় ৫৪ ঘণ্টা মহাকাশে অবস্থান করেন এবং পৃথিবীকে ৩৬ বার প্রদক্ষিণ করেন। ১৪ এপ্রিল তারা নিরাপদে ক্যালিফোর্নিয়ার এডওয়ার্ডস এয়ার ফোর্স বেসে অবতরণ করেন। এই মিশনে ব্যবহৃত প্রযুক্তি ছিল অত্যন্ত জটিল বহির্ভাগে বিশাল জ্বালানি ট্যাংক এবং দুটি শক্তিশালী সলিড রকেট বুস্টার। তবুও সফলতার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, মহাকাশযাত্রা ভবিষ্যতে নিয়মিত এবং কার্যকর হতে পারে।
পরবর্তীতে স্পেস শাটল প্রোগ্রামের মাধ্যমে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, মহাকাশ গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে নাসা। তবে ইতিহাসের প্রতিটি উজ্জ্বল অধ্যায়ের পেছনে কিছু বেদনাও থাকে। ২০০৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, ‘কলম্বিয়া’ তার ২৮তম মিশন শেষে পৃথিবীতে ফেরার পথে ভেঙে পড়ে। এই দুর্ঘটনায় সাতজন নভোচারীর প্রাণহানি ঘটে, যা মহাকাশ অভিযানের ঝুঁকির এক মর্মস্পর্শী স্মারক।
এই দিনটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। ১৬৩৩ সালের ১২ এপ্রিল শুরু হয় গ্যালেলিও গ্যালিলি-এর বিচার। তিনি প্রচলিত পৃথিবীকেন্দ্রিক ধারণার বিরোধিতা করে বলেন, পৃথিবী নয়, পৃথিবীই সূর্যের চারপাশে ঘোরে। এই সৌরকেন্দ্রিক মতবাদ তৎকালীন চার্চের বিরোধিতার মুখে পড়ে। বিচার চলাকালে তাঁকে তাঁর মতবাদ প্রচার থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করা হয়। তবুও জ্ঞানের আগুন সহজে নেভে না। গ্যালিলিও তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান নিভৃতে। ১৬৪২ সালে ৭৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হলেও, তাঁর ধারণাই আজকের আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি।