কেন কিছু মানুষ মশার কাছে “চুম্বক” হয়ে ওঠেন? নতুন গবেষণায় মিলছে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। অ্যালকোহল সেবন করলেও এটিও এমন একটি কারণ হতে পারে, যা আপনাকে মশার কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে বলে ধারণা বিজ্ঞানীদের।
কখনো কি মনে হয়েছে, মশা যেন সবাইকে বাদ দিয়ে শুধু আপনাকেই কামড়ায়? বিজ্ঞানীরা এখন সেই জটিল রাসায়নিক মিশ্রণের রহস্য উদ্ঘাটনে অগ্রগতি করছেন, যা কিছু মানুষকে এই রোগবাহী রক্তচোষা পোকাদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে। ফ্রান্সের উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউটের চিকিৎসা কীটতত্ত্ববিদ ফ্রেডেরিক সিমার্ড বলেন, “এটা কোনো ভুল ধারণা নয়। মশা সত্যিই কিছু মানুষের প্রতি অন্যদের তুলনায় বেশি আকৃষ্ট হয়।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “আমরা সবাই সব সময় মশার চুম্বক নই।”
বিজ্ঞানীদের মতে, মশা মানুষ বেছে নেয় বিভিন্ন সংবেদনশীল সংকেতের ভিত্তিতে। এর মধ্যে রয়েছে শরীরের গন্ধ, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং নিঃশ্বাসের সঙ্গে বের হওয়া কার্বন ডাই অক্সাইড। শুধু স্ত্রী মশাই কামড়ায়, আর তাদের অত্যন্ত সংবেদনশীল রিসেপ্টর এই সংকেতগুলো শনাক্ত করে লক্ষ্য ঠিক করে। সুইডিশ বিজ্ঞানী রিকার্ড ইগনেল বলেন, “আমরা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে জানি যে, নিঃশ্বাসের সঙ্গে বের হওয়া কার্বন ডাই অক্সাইড মশাকে আকৃষ্ট করে। কয়েক ডজন মিটার দূর থেকেই এটি তাদের সক্রিয় করে তোলে।” তিনি আরও বলেন, “প্রায় ১০ মিটারের মধ্যে এলে মশা মানুষের গন্ধ শনাক্ত করতে শুরু করে। কার্বন ডাই অক্সাইডের সঙ্গে এই গন্ধ মিলেই তাদের আকর্ষণ আরও বাড়ায়।” মশা কাছাকাছি এলে শরীরের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিছু মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বেশি তাপ ও গন্ধ নির্গত করেন, ফলে তারা বেশি কামড়ের শিকার হন।
তবে জনপ্রিয় কিছু ধারণা পুরোপুরি ভুলও হতে পারে। যেমন, নির্দিষ্ট রক্তের গ্রুপের মানুষকে মশা বেশি কামড়ায়, এমন দাবির “কোনো শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই” বলে জানান সিমার্ড। তিনি বলেন, “এ নিয়ে কিছু ছোট গবেষণা হয়েছে, কিন্তু অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা খুবই কম ছিল। ত্বক, চোখ বা চুলের রঙের সঙ্গেও এর কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।” অন্যদিকে, শরীরের গন্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের ত্বকে থাকা অণুজীব বা মাইক্রোবায়োম বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগ তৈরি করে, যা মশার কাছে কম বা বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ ৩০০ থেকে ১,০০০ ধরনের গন্ধযুক্ত যৌগ নিঃসরণ করে। বিজ্ঞানীরা এখনো খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন, এর মধ্যে কোনগুলো মশাকে সবচেয়ে বেশি টানে। গবেষকরা পরীক্ষাগারে ৪২ জন নারীর ওপর এডিস ইজিপ্টি মশা ব্যবহার করেন। এই প্রজাতির মশা ডেঙ্গু ও হলুদ জ্বর ছড়ানোর জন্য পরিচিত। গবেষণায় দেখা যায়, মশা মানুষের শরীরের বিভিন্ন গন্ধযুক্ত যৌগের সমন্বয় শনাক্ত করতে পারে। সম্ভাব্য এক হাজার যৌগের মধ্যে বিজ্ঞানীরা ২৭টি যৌগ শনাক্ত করেছেন, যেগুলো মশা বুঝতে সক্ষম।
যেসব নারীকে মশা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেছিল, তাদের শরীরে “১-অক্টেন-৩-অল” নামের একটি যৌগ বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। “মাশরুম অ্যালকোহল” নামে পরিচিত এই যৌগ ত্বকের তেল সিবাম ভাঙার ফলে তৈরি হয়। গবেষকদের মতে, এই যৌগের সামান্য বৃদ্ধিও মশার আকর্ষণ অনেক বাড়িয়ে দেয়। বিয়ার বা অ্যালকোহল পানও মশাকে আকৃষ্ট করতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিয়ার বা অ্যালকোহল শরীরের তাপমাত্রা বাড়ায়, নিঃশ্বাসের সঙ্গে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি করে এবং ত্বকের গন্ধ পরিবর্তন করে।
বুরকিনা ফাসোর পরিচালিত এক গবেষণায় স্বেচ্ছাসেবকদের প্রথমে বিয়ার এবং পরে পানি পান করানো হয়। এরপর দেখা যায়, ম্যালেরিয়া বহনকারী অ্যানোফিলিস মশা বিয়ার বা অ্যালকোহল পানকারীদের গন্ধে বেশি আকৃষ্ট হয়েছে। এছাড়া, নেদারল্যান্ডসে ২০২৩ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় ৪৬৫ জন স্বেচ্ছাসেবক মশাভর্তি খাঁচায় হাত ঢুকিয়েছিলেন। যেসব ব্যক্তি আগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিয়ার পান করেছিলেন, মশা তাদের প্রতি ১.৩৫ গুণ বেশি আকৃষ্ট হয়েছিল।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে মশার বিস্তার বাড়ছে। ফলে কেন কিছু মানুষকে মশা বেশি কামড়ায়, তা বোঝা এখন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। উদাহরণ হিসেবে, চিকুনগুনিয়া ভাইরাস বহনকারী টাইগার মশা নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। গত বছর প্রথমবারের মতো ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চল আলসাস পর্যন্ত চিকুনগুনিয়ার বিস্তার দেখা গেছে।
তাহলে মশার কামড় এড়াতে কী করা যায়?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, ঢিলেঢালা ও শরীর ঢাকা পোশাক পরা, মশারি ব্যবহার করা এবং মশা তাড়ানোর স্প্রে ব্যবহার করা। পাশাপাশি হালকা খাবার খাওয়া ও মদ্যপান সীমিত রাখারও পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা।
সূত্র: পিএইচইয়া.আর্গ