এমআইটি এর গবেষকেরা এমন একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন যা বায়ুমণ্ডল থেকে জল সংগ্রহের ধারণাকে নতুন গতিশক্তি দেবে, যেন দীর্ঘদিন ধরে ধীরগতির এক পুরোনো যন্ত্র হঠাৎ দৌড়ে উঠতে শিখে গেছে। এতদিন AWH বা atmospheric water harvesting প্রযুক্তি বাতাসের আর্দ্রতাকে তরল জলে রূপান্তর করলেও, প্রক্রিয়াটি ছিল সময়ের ব্যাপার, অনিশ্চিত এবং প্রকৃতির মর্জির উপর নির্ভরশীল।
প্রচলিত সিস্টেমে আর্দ্র বাতাস সাধারণত ঠান্ডা করা হয় বা স্পঞ্জমতো সর্বেন্ট উপাদান ব্যবহার করা হয় যা জলীয় বাষ্প টেনে নিয়ে নিজের গর্ভে আটকে রাখে, তারপর সূর্যের তাপে ধীরে ধীরে সেই জলকে ছাড়ে। এই পদ্ধতি মরুভূমি অঞ্চলের মতো কঠিন পরিবেশে অকার্যকর হয়ে পড়ে কারণ সেখানে সূর্যালোক থাকলেও তাপমাত্রার বিশাল ওঠানামা, শুষ্ক হাওয়া এবং সীমিত সম্পদ পুরো ব্যবস্থাকে স্থবির করে দেয়। ঠিক এই জায়গাতেই MIT-এর গবেষণা দল যেন আর্দ্রতার অণুগুলোর হাতে এক নতুন স্বাধীনতার চাবি তুলে দিয়েছে।
তারা সর্বেন্টের ভেতরে আটকে থাকা জলীয় বাষ্পকে অত্যন্ত দ্রুত মুক্ত করার জন্য বেছে নিয়েছে সাউন্ডের এক অদৃশ্য, অতিহালকা, কিন্তু প্রচণ্ড শক্তিশালী তরঙ্গ আল্ট্রাসাউন্ড। মানুষের শ্রবণশক্তির সীমার উপরে ২০ কিলোহার্টজের বেশি ফ্রিকোয়েন্সিতে ভ্রমণ করা এই শব্দ তরঙ্গ সর্বেন্টের ভেতরের জল এবং উপাদানের মধ্যকার দুর্বল বন্ধনকে সূক্ষ্মভাবে ভেঙে দেয়, যেন ক্ষুদ্র অণুগুলোকে ঘুমঘোর থেকে টেনে তুলে মুক্ত আকাশে ছুড়ে দেয়। ডিভাইসটির কেন্দ্রে রয়েছে একটি সমতল সিরামিক রিং, যা ভোল্টেজ পেলে দ্রুতগতির কম্পনে নেচে ওঠে এবং সেই নাচের তালে সৃষ্টি হয় অত্যন্ত লক্ষ্যভেদী চাপ, চাপ যা জলের অণুগুলোকে আলাদা করে ছোট ছোট ফোঁটায় পরিণত করে। গবেষণার প্রধান লেখিকা ইকরা ইফতেখার শুভ এই প্রক্রিয়াকে বর্ণনা করেছেন যেন জল তরঙ্গের সাথে উঠে-নেমে নিজের মুক্তির ছন্দ খুঁজে পায়।
আরো পড়ুন
ডিভাইসটি পরীক্ষা করতে গবেষকেরা বিভিন্ন মাত্রায় আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রিত চেম্বারে চতুর্থাংশ আকারের সর্বেন্ট নমুনা সম্পূর্ণ স্যাচুরেট করে তারপর সেটিকে আল্ট্রাসনিক অ্যাকচুয়েটরের উপর স্থাপন করেন। ফলাফল ছিল প্রত্যাশার সীমা ছাড়িয়ে যেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে জল ছাড়তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যেত, সেখানে নতুন ডিভাইসটি মাত্র কয়েক মিনিটে নমুনাকে সম্পূর্ণ শুকিয়ে দেয়। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এই পদ্ধতি বাষ্পীভবন নির্ভর জল নিষ্কাশন প্রক্রিয়ার চেয়ে ৪৫ গুণ বেশি দক্ষ, যা তাদের ১৮ নভেম্বর Nature Communications এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে নথিভুক্ত হয়েছে।
এই প্রযুক্তির একটি বড় দিক হলো এটি ভবিষ্যতের জলের অভাব পীড়িত অঞ্চলগুলোর জন্য বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। মরুভূমি, উপকূলহীন এলাকা বা এমন অঞ্চল যেখানে লবণাক্ত জল পর্যন্ত নেই। এসব জায়গা সামান্যতম আর্দ্রতাও খুঁজে পেতে বাতাসের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেখানে সূর্যালোকের উপর নির্ভরশীল ধীরগতির প্রযুক্তিকে দ্রুতগতির, পুনঃপুন ব্যবহারযোগ্য, কম্প্যাক্ট ব্যবস্থায় রূপান্তর করা গুরুত্বপূর্ণ। এমআইটির দলটি বলছে, তাদের ডিভাইসটি একটি ছোট সৌরকোষ দিয়ে চালানো সম্ভব এবং সেই সৌরকোষই সেন্সর হিসেবেও কাজ করতে পারে যা সর্বেন্ট কখন পূর্ণ হয়েছে তা শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জল মুক্ত করার চক্র শুরু করবে। এতে দিনে একাধিকবার জল সংগ্রহ করা যাবে, যা এখন পর্যন্ত কোনো AWH সিস্টেমই করতে পারেনি।
গবেষকেরা এমন একটি ভবিষ্যতের কল্পনা করছেন যেখানে ঘরের জানালার আকারের একটি ডিভাইস প্রতিদিন নীরবে বাতাস থেকে জল ধরে, অতিস্বনক তরঙ্গের শক্তিতে সেই জলকে মুক্ত করে, ছোট নজল দিয়ে সংগ্রহ করে এবং ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে দেয়। এটি বিদ্যমান যেকোনো সর্বেন্ট উপাদানের সাথে যুক্ত করা যায়, কারণ এর কাজ হলো মূল উপাদানের জল আটকানোর ক্ষমতাকে বাড়ানো নয়, বরং সেই জলকে দ্রুত পুনরুদ্ধারযোগ্য করে তোলা। এই পুনরুদ্ধারের গতি যত বাড়বে, দৈনিক জলের পরিমাণও ততগুণ বাড়বে।
এমআইটির নতুন আল্ট্রাসনিক জল সংগ্রহ প্রযুক্তি কেবল একটি যন্ত্রের উদ্ভাবন নয়, এটি বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতার মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। দীর্ঘদিন মানবসভ্যতা বাতাস থেকে জল সংগ্রহের স্বপ্ন দেখেছে। এবার হয়তো সেই স্বপ্ন কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাতের মুঠোয় আসতে চলেছে।


Leave a Reply