
গবেষকেরা নতুন গবেষণায় মহাবিশ্বের বয়স সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন। তারা খুব পুরোনো কিছু নক্ষত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে এসব নক্ষত্রের সম্ভাব্য বয়স প্রায় ১৩.৬ বিলিয়ন বছর। নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা, অবস্থান ও দূরত্বের সুনির্দিষ্ট তথ্য ব্যবহার করে এই বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, মহাবিশ্বের বয়স কখনোই এর ভেতরের সবচেয়ে পুরোনো নক্ষত্রের চেয়ে কম হতে পারে না, তাই এই ফলাফল মহাবিশ্বের বয়স বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়।
মহাবিশ্বের বয়স
বর্তমান মহাজাগতিক তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্ব কত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে তা বোঝাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মান ব্যবহার করা হয়, যাকে হাবল ধ্রুবক বলা হয়। এই মান যত বেশি হবে, মহাবিশ্বের বয়স তত কম ধরা হয়, আর মান যত কম হবে, মহাবিশ্বকে তত পুরোনো ধরা হয়। সমস্যা হলো বিভিন্ন পদ্ধতিতে এই মান মাপলে ভিন্ন ভিন্ন ফল পাওয়া যায়। কাছাকাছি মহাবিশ্বে সেফিড নক্ষত্র ও সুপারনোভা পর্যবেক্ষণ করে পাওয়া হিসাব অনুযায়ী মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩ বিলিয়ন বছর হতে পারে। কিন্তু মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমির তথ্য বিশ্লেষণ করলে বয়স প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর পাওয়া যায়। এই পার্থক্যকেই বিজ্ঞানীরা হাবল টান বা হাবল উত্তেজনা বলে থাকেন।
এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গবেষকেরা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির খুব পুরোনো নক্ষত্রগুলোকে একটি ধরনের “ঘড়ি” হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যদি এসব নক্ষত্রের সঠিক বয়স জানা যায়, তাহলে মহাবিশ্বের বয়সের একটি সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব। এ কাজে ইতালির বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাজাগতিক গবেষক দল এবং জার্মানির এআইপি-এর নক্ষত্র গবেষক দল একসঙ্গে কাজ করেছে। তারা আগের গবেষণায় তৈরি করা একটি বড় ডেটাসেট ব্যবহার করেছেন, যেখানে মিল্কিওয়ের দুই লক্ষের বেশি নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা, অবস্থান ও দূরত্বের তথ্য সংরক্ষিত ছিল।
গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার গাইয়া মিশনের তৃতীয় ডেটা প্রকাশ। এই মিশন নক্ষত্রগুলোর দূরত্ব ও বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত নির্ভুলভাবে মাপতে পারে। সেই তথ্য ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বয়স নির্ধারণ করা যায় এমন নক্ষত্রগুলো বেছে নেন এবং সম্ভাব্য ভুল বা দূষণকারী তথ্য বাদ দেন। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১০০টি অত্যন্ত পুরোনো নক্ষত্রের একটি তালিকা তৈরি করা হয়। এসব নক্ষত্রের সম্ভাব্য গড় বয়স প্রায় ১৩.৬ বিলিয়ন বছর পাওয়া গেছে।
আরো পড়ুন: লাল আভায় দেখা যাবে চাঁদ ৩ মার্চ
এই ফলাফল থেকে বোঝা যায় যে মহাবিশ্ব অন্তত এত পুরোনো হতে পারে। এই বয়স সেফিড ও সুপারনোভা থেকে পাওয়া কম বয়সের হিসাবের সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না, কিন্তু মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ পটভূমি থেকে পাওয়া বেশি বয়সের হিসাবের সঙ্গে বেশ ভালোভাবে মিলে যায়। তাই গবেষণাটি হাবল ধ্রুবক নিয়ে চলমান বিতর্কে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করেছে।গবেষকদের মতে, নক্ষত্রের সঠিক বয়স নির্ধারণ করা খুব কঠিন কাজ হলেও এখন আমাদের কাছে যে পরিমাণ উন্নত তথ্য রয়েছে তা আগে কখনো ছিল না। গাইয়া মিশনের ভবিষ্যৎ ডেটা প্রকাশ হলে নক্ষত্রের বয়স আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে এবং তখন মহাবিশ্বের প্রকৃত বয়স ও সম্প্রসারণের হার সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
এই গবেষণাটি ২০২৬ সালে অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার প্রধান লেখক ছিলেন বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী এলেনা টমাসেটি এবং তার সহকর্মীরা। তাদের মতে, ভবিষ্যতে আরও উন্নত পর্যবেক্ষণ ও নতুন তথ্য পাওয়া গেলে মহাবিশ্বের বয়স নির্ধারণ এবং হাবল ধ্রুবকের প্রকৃত মান বোঝার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি সম্ভব হবে।
https://phys.org/news/2026-03-universe-oldest-stars-clue.html থেকে সংগৃহীত।
