২০২৬ সালের জুন মাসে এল নিনো আবারও সক্রিয় হয়েছে এবং এটি ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী হচ্ছে। নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অংশে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উষ্ণ সমুদ্রের পানি এই জলবায়ুগত ঘটনার প্রধান বৈশিষ্ট্য। জুন মাসে সেন্টিনেল-৬ মাইকেল ফ্রেইলিচ স্যাটেলাইটের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়েছে, যা এল নিনোর শক্তি বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
এল নিনো কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক ও নিয়মিত জলবায়ুগত ঘটনা, যা বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। এর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সাধারণত বেশি বৃষ্টিপাত হয়, অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোতে খরা দেখা দিতে পারে। এনওএএ এর ১১ জুন ২০২৬ আনুষ্ঠানিকভাবে এল নিনো ঘোষণা করে, কারণ মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা টানা কয়েক মাস ধরে গড়ের তুলনায় অন্তত ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কেন বাড়ে?
সমুদ্রের পানি উষ্ণ হলে তা প্রসারিত হয় এবং ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পায়। তাই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পরিমাপ করে বিজ্ঞানীরা সমুদ্রে কতটা তাপ জমা হয়েছে তা নির্ধারণ করতে পারেন। ৮ জুন ২০২৬-এর মানচিত্রে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দেখা যায়। মানচিত্রে লাল রঙ উচ্চ সমুদ্রপৃষ্ঠ, সাদা স্বাভাবিক এবং নীল কম উচ্চতা নির্দেশ করে।
এই তথ্য সংগ্রহ করেছে সেন্টিনেল-৬ মাইকেল ফ্রেইলিচ স্যাটেলাইট, যা ২০২০ সালে নাসা ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ইএসএ) নেতৃত্বে উৎক্ষেপণ করা হয়। তথ্য বিশ্লেষণ করেছে নাসা জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরি (জেপিএল)। বিশ্লেষণের সময় মৌসুমি পরিবর্তন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বাদ দিয়ে শুধুমাত্র এল নিনো ও অন্যান্য স্বল্পমেয়াদি প্রাকৃতিক পরিবর্তনের প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে।
কেলভিন তরঙ্গের ভূমিকা কী? ২০২৬ সালের বসন্ত থেকেই স্যাটেলাইট বিশাল আকারের উষ্ণ পানির তরঙ্গ, অর্থাৎ কেলভিন ওয়েভ শনাক্ত করতে শুরু করে। এই তরঙ্গগুলো পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর থেকে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়, যখন বাণিজ্যিক বায়ু দুর্বল হয়ে সাময়িকভাবে পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হতে শুরু করে। এর ফলে উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে জমা হয়, উষ্ণ পানির স্তর গভীর হয় এবং দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকার উপকূলের কাছে সাধারণত যে ঠান্ডা পানি ওপরে উঠে আসে, তা বাধাগ্রস্ত হয়।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ? সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা শুধু উপরের স্তরের অবস্থা জানায়, কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পরিমাপ করে বিজ্ঞানীরা পানির নিচে কতটা তাপ সঞ্চিত রয়েছে তাও বুঝতে পারেন। যদি উষ্ণ স্তর অগভীর হয়, তাহলে জলবায়ুর ওপর এর প্রভাব তুলনামূলক কম হতে পারে। কিন্তু গভীর স্তরে বিপুল পরিমাণ তাপ জমা থাকলে তা বৈশ্বিক আবহাওয়ার ওপর অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
১৯৯৭ সালের সঙ্গে তুলনা JPL-এর সমুদ্রপৃষ্ঠ গবেষক ও সেন্টিনেল-৬ প্রকল্পের উপ-প্রধান বিজ্ঞানী সেভেরিন ফুরনিয়ে জানান, ৮ জুন ২০২৬-এ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের পরিস্থিতি অনেকটাই ১৯৯৭ সালের মতো ছিল। ১৯৯৭ সালে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হয়েছিল। তবে ২০২৬ সালে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে উষ্ণতার বিস্তার এখনও কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে এবং একই সময়ে ১৯৯৭ সালের তুলনায় কম কেলভিন তরঙ্গ তৈরি হয়েছে। তবুও আরও উষ্ণ কেলভিন তরঙ্গ পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এল নিনো এখনও শক্তিশালী হচ্ছে। এটি ১৯৯৭ সালের মতো শক্তিশালী হবে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক সপ্তাহে সমুদ্রের পরিবর্তনের ওপর। বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বড় ধরনের এল নিনোর সম্ভাবনা দেখাচ্ছে, তবে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও পর্যবেক্ষণের ।